Saturday , October 31 2020
ফাইল ছবি

অবহেলিত টোকাই

“অবহেলিত টোকাই”

লেখক: রাজিব হোসেন সুজন


আর এক প্লেট ভাত খামু স্যার! আইজগো অনেকদিন পর ভালো তরকারি দিয়া ভাত খাইছি তাই প্যাটের মধ্যে ক্ষিদা আরো বাইড়া গেছে। আমারে আরেক প্লেট ভাত খাওয়াইবেন স্যার?

কথাটি আজও কানে ভাসছে। ডিগ্রি ১ম বর্ষের ইকোনমিকস (বিএসএস) পরিক্ষা শেষে যখন সাথী (আমার বান্ধবী) আর আমি সবেমাত্র বসেছিলাম।

তখনই ছেলেটি এসে বললো সাথীকে বললো ম্যাডাম আমারে এক প্লেট ভাত খাওয়াইবেন? অনেক ক্ষিদা লাগজে। তাকিয়ে রইলাম আমি ও সাথী। আমরা কিছু বলার আগেই ছেলেটি আমাকে বললো স্যার এক প্লেট খাওয়াইবেন? অনেক ক্ষিদা লাগজে। বলার সাথে সাথেই সেরাজ ভাইকে ডাক দিয়ে বললাম খাবার নিয়ে আসেন। আর গরুর গোস্ত ও বড় ইলিশ মাছ নিয়ে আসেন।

সেরাজ ভাই সাথে টমেটো ও পিঁয়াজও নিয়ে আসলো।

ছেলেটি খাওয়া শুরু করলো। এমনভাবে খাচ্ছে যে মনে হয় কতদিন যেন না খেয়ে আছে। আমরা শুধু তাকিয়ে আছি। এরই মধ্যে ছেলেটি আবার বলে উঠলো আর এক প্লেট ভাত খামু স্যার! আইজগো অনেকদিন পর ভালো তরকারি দিয়া ভাত খাইছি তাই প্যাটের মধ্যে ক্ষিদা আরো বাইড়া গেছে। আমারে আরেক প্লেট ভাত খাওয়াইবেন স্যার?

এবার সেরাজ ভাই আমার অর্ডার পাওয়ার আগেই নিয়ে আসলো। কারন, সেও ওর দিকে তাকিয়ে দেখছিলো।

ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি নাম তোর? বললো অপু। কি করিস তুই? কাগজ টোকাই স্যার।

আমি বললাম কেন? তোর বাবা-মা নেই?

বাবা মারে কোনদিন চোখে দেখিনাই স্যার। আমি বড় হইছি এক চাচী’র কাছে সেই চাচী’টাও বড় দুঃখিনী আছিলো তার স্বামী সন্তান ছিলো না।
এক সকালে ভোরে মাইনষের চেঁচামিচিতে উইঠা দেখি চাচী’র ঘরের সামনে অনেক ভীড়!
ভীড় ঠেইলা যাইয়া দেহি চাচী ঘুমায় আর চারপাশের থেইকা মানুষ ঘিরে রাখছে। আমি কিছুই বুঝতে পারিনাই তখন সেসময়। আবার গিয়া পাশের ঘরে শুইয়া পড়ছি। কিছুক্ষন পর একজন আইসা কয় তোর চাচী মইরা গেছে।
জানেন স্যার ঐদিন খুব কাঁদছিলাম। ঐডাই ছিলো আমার শেষ কান্না এরপর কতকিছু হইছে আমার লগে কিন্তু কখনো কান্না আসেনাই।

তোর চাচী কখনো তোর বাবা মায়ের কথা বলে নাই??? বা তুই কখনো জানতে চাস নি কি তোর পরিচয়?
কোথায় তোর বাবা মা?

অনেক জিজ্ঞেসা করেছি স্যার চাচী’রে আমার বাবা মা কোথায়?
চাচী ও বলতে পারেনাই শুধু কইছে আমারে নাকি এক ডোবার কাছ থেইকা কুড়াইয়া পাইছে। জানেন স্যার অনেকেই আমারে জারজ কইয়া ডাকে আমার নাকি জন্মের ঠিক নাই। কেউ আমারে বাবা মায়ের নাম জিগাইলে কইতে পারিনা।
আচ্ছা স্যার বাবা মায়ের নাম না জানলে কি মানুষ হওয়া যায়না?
আমার কি অপরাধ কন স্যার???

কোনো উত্তর দিতে পারলাম না আমি। ছেলেটিকে বললাম আমার সাথে যাইবি?
বলে না স্যার, এক সাহেব আমারে তার বাসায় নিয়ে গেছিলো। তার বাসার সব কাজ আমি করতাম। তারপরও ম্যাডাম আমারে অনেক মারতো। এখন কাগজ টোকাই, ভালোই আছি। কেউ আর মারেনা!। আমি সেই সাহেবের বাড়ির কথা আজ ও ভুলিনাই। সারাদিন কাগজটুকাইয়া রাতে স্টেশনে এসে ঘুমাতে পারলেও শান্তি তবু কারোর গোলাম না এই আশ্বাস দিতে পারি নিজেকে। এভাবে বলে চলে গেলো অপু। পিছন থেকে আর ডাকতে পারলাম না। আস্তে আস্তে মানুষের ভীড়ে হারিয়ে গেলো। শুধু তাকিয়ে রইলাম!!

Check Also

তদন্ত (পর্ব-০৫)

তদন্ত লেখক: রুদ্র অয়ন সহসা টেলিফোনে বেজে ওঠে। সজীব রিসিভার তুলে কথা বলে সজীব। ফোন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *