Saturday , October 31 2020

একটি প্রত্যয়ের জন্ম

একটি প্রত্যয়ের জন্ম

-সাধন সরকার


অনেক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির সবই আর মনে থাকে না কারো। মানুষ যে পরিবেশে বেড়ে উঠতে থাকে আশে পাশে যা দেখে, সব ছবিই আর মনে গভীর দাগ কাটেনা। কিন্তু কিছু কিছু ছবি এমনভাব দাগ কেটে বসে যায় যে শত আনন্দ-দুঃখের তাপেও তা আর মুছে যায় না। সে ঘটনা আনন্দের হোক, দুঃখের হোক, হাসির হোক অবসর সময়ে মনের গভীর হতে বুদ্বুদের মত বাইরে বেরিয়ে আসতে থাকে, তখন তার রূপ তার চেহারা নতুন করে দেখতে পাই যেন।

তখন সবে গান শেখার কাল। বয়স কিশোর পেরিয়ে যৌবনের প্রারম্ভের তীর ছুঁয়েছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, অভাব অনটন নিত্য সঙ্গী। তবু মনে অসীম উৎসাহ কঠিন প্রতিজ্ঞা, এর শেষ চূড়ায় পৌঁছতেই হবে; সুতরাং অগ্রগতির প্রতিযোগিতায় যারা প্রতিবন্ধক সে সব থেকে দূরে দূরে নিজেকে সরিয়ে রাখতেই হবে। ভালবাসা এল একদিন, সর্বাঙ্গে তার আকর্ষণের তীব্রতা, পোষাকে-আশাকে কামনা উদীপ্ত আতর, বললে- কি করছো? সাধনা। প্রস্তুতিপর্বের শিল্পী বললে- এ আমার প্রস্তুত হবার সময়, এমন সময়তো তোমায় আমি আশা করিনি।

কেন? আসতে নেই নাকি?
না, না আসবে না কেন, কিন্তু এ সময়ে নয়।
কেন ? আমাকে ভাল লাগে না তোমার?
খুব ভাললাগে, কিন্তু তুমিতো জান আমি কত নিরূপায়। আমাকে যেয়ে এর শেষ চূড়ায় পৌঁছতে হবে।
কিন্তু আমিতো ভালবাসা হয়ে এসেছি। বাধা হয়ে তো আসিনি।
এ ভালবাসা আমার সাধনার বাধা। তুমি আজ যাও। পারতো প্রতীক্ষা করো, সময়মত আমিই যাব তোমার কাছে।
সময়। হাসল সে, বললে দিন-ক্ষণ, পুঁথি-পাঁজি দেখে আমিতো আসতে পারিনে, হঠাৎ অনিশ্চিত ক্ষণ, মুহূর্তে আমি আসি।
বেশ আমি সেই ক্ষণের প্রতীক্ষায় রইবো। কিন্তু এখন আমি নিরূপায়।
ফিরে গেল সে।

আবারো তীব্রতর হলো শিল্পীর সাধনা, জ্ঞানের শিখাটাকে উজ্জ্বল করে দিল। যৌবনের পালে তখন জোয়ার। এমনি সময় উচ্চশিক্ষিত রাজ কর্মচারীর বেশে এলো কৌতুক। গায়ে কালো জামা, মেকি হীরের দ্যুতি। আসর বসলো, অনুরোধ এলো- এই যে মাস্টার মশাই- অনেক দিন আপনার কন্ঠে বসন্ত বাহার শুনিনি। আজ ওটাই শুরু হোক।

রাগের আলাপ শুরু হল, কিন্তু একি ! এ যে ইমন কল্যাণ। তবে বসন্ত বাহার কি হলো, মাস্টার মশাই একি করছেন? যৌবন হতবাক, ক্ষুব্ধ, অনেক বাহবা নিয়ে আসর শেষ হল। মাস্টার মশাই বললেন, দেখলে তো এরা কেমন গান বোঝে? কতগুলো রাগের নাম মুখস্ত করে রেখেছে। রুচিতে হালকা গান পছন্দ, অথচ উচ্চাঙ্গ শোনা চাই। রাজ কর্মচারীতো, শুনেছে অনেক রাজা-বাদশারা উচ্চাঙ্গ গান শুনতেন। আরে তারা সঙ্গীত বুঝতো, তার জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করতে কুন্ঠা বোধ করতো না। কিন্তু একি? দেখলে তো?

যৌবন বিমর্ষ হয়ে বসে রইল এক কোনে। কৌতুক গুটি গুটি পায়ে এসে শুধালো।
কি শিল্পী, রাগ করেছ নাকি?
না, তবে খুব দুঃখ পেয়েছি।
কেন তুমি জান না, আজকের পৃথিবী এমনি, সাজানো সঙে ভরা।

যৌবন খুশী হল না তাতে, কৌতুকের মুখের দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইল। কৌতুক তখন বলে চলেছে। …… দেখ শিল্পী সামান্য প্রবঞ্চনায় হতাশ হতে নেই। চোখ খোলা রেখে তাকিয়ে দেখ দেখি, আজ যে সাহিত্যিক নয়, সেই কেমন কায়দা করে সাহিত্যিক সেজে প্রশংসা কুড়োচ্ছে। যে কবি নয়, সে পরের কবিতা কায়দা করে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে। আজকের সমাজ কি দেখ, যে সঙ্গীত বোঝে না, তারই বাড়ী রেডিওগ্রাম, টেপ রেকর্ডার। যার আর অর্থের ভাবনা নেই, সেই কৃপণ। যার বাড়ির দরকার নেই, সেই বাড়ি বানাচ্ছে। যে ভাল খেলতে পারে না, খেলা বোঝে না, সেই খেলা পরিচালনা করে। এগুলো কেমন করে হয় জান?

না।
পদমর্যাদার জোরে, রাজার রাজত্বে এই পদ মর্যাদার দাম বড় বেশী।
কিন্তু মেকি এই পদমর্যাদা নিয়ে লাভ?
লাভ নেই বলছ কি? সমাজে প্রতিষ্ঠা, ধন সম্পদ, মান মর্যাদা, খাতির তোষামোদ, এক কথায় জাগতিক সমস্ত প্রাপ্তির সুযোগ।
বুঝলাম, কিন্তু আসলেতো ক্ষতিই হচ্ছে !
তা হোক, এতো ব্যাক্তিগত ক্ষতি নয়, সমাজের ক্ষতি, জাতির ক্ষতি। সমাজ আর জাতি নিয়ে বজ্জাতি চলছে দেখছোনা? সমাজ, জাতি
টিকলো কি বাঁচলো এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, আত্ম তুষ্টি বড় কথা।
কিন্তু এমনি করেই কি চিরকাল কাটিয়ে দেবে কৌতুক। তুমিকি ভাল কিছু করতে পার না?
আমার ভালো দিকটাও আছে, সেটা নির্মম নয়, কেবল আনন্দ বিতরণ করে মানুষের জীবন আনন্দে ভরিয়ে তোলা। সে সময় এখনও
তোমাদের দেশে আসেনি, আমাকে যেভাবে তোমরা গ্রহণ করেছ আমি সেই রূপেই ফসল ফলাচ্ছি।
সেই যেদিন তুমি কেবল নির্মল আনন্দে, মানুষের মন প্রাণ খুশীর জোয়ারে তরঙ্গ খেলবে, তোমাকে যেদিন কেউ ঘৃণা করবে না, সেদিনের
আর বাকি কত?
তাতো আমি বলতে পারি না শিল্পী, তোমার সাধনা দিয়ে তুমিই একদিন এর উত্তর খুঁজে পাবে। আমি তবু তোমাকে মনের উৎসাহ আর
প্রেরণা জুগিয়ে গেলাম। পরে আবার হয়তো আমার সাক্ষাত পাবে।
যৌবন তখন ভাবছে, পথ খুঁজছে, আর সময় কত হল দেখছে।
আনন্দ এল সেদিন বৃদ্ধের বেশে। কন্ঠে খুশীর জোয়ার, Ñআহা Ñহা Ñ এমন মধুর তান কে দিলো?
শিল্পী তান বন্ধ করে তাকালো, চোখে প্রশ্ন। আনন্দ তখন বলে চলেছেÑ বাঃ বড় সুন্দর তান- এটা কি রাগিনী?
পটদীপ।
বাঃ বড় সুন্দর। আমাদের সময় এ রাগিনী আমরা শুনিনি। বসবো একটু?
বসুন। আচ্ছা আপনার পদ মর্যাদা নেই?
কিযে বল বাবা; এককালে ঠেকেছি এখন, কবে ডাক আসে ঠিক নেই। এখন ওসব বাহুল্য দিয়ে কি করবো বল? সুরটা ভালো লাগলো, এসে
বসে পড়লুম।
পদ মর্যাদা থাকলে আর আসতে পাারতেন না।
কেন? এতে অমর্যাদারতো কিছু নেই।
তা, জানি না, তবে পদ মর্যাদা আপনাকে আসতে দিতো না। এই আসরে আপনিই এবং আপনার মত দু’একজন ছাড়া অনাহুত কেউ আসেনা
কিনা। তাই বলছিলাম।

তীব্র মর্যাদা বোধ থাকলে আনন্দ কম হয় জান শিল্পী। আমিতো বৃদ্ধ তুমি আমার বয়সে কতো ছোট, রাগিনীটার নামটা পর্যন্ত জানিনে। তোমার কাছ থেকে শুনে নিলাম এতে আমার মর্যাদার কথা বলতে পারিনে, তবে আনন্দ কমেনি একটুও। গাও, গানটা শেষ করো। সেদিন গানটা শেষ হল, কন্ঠে উৎসাহ নিয়ে, পরিবেশ আনন্দে ঢেলে। সেদিন বয়স নিয়ে কেউ মাথা ঘামালো না। স্থান নিয়ে কেউ কথা তুললো না। জাত নিয়ে সংকীর্ণ মনের পরিচয় কেউ দিল না। কেবল হৃদয়ের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলি উজ্জিবীত হয়ে হৃদয়ে মিশে একাকার হয়ে গেল।

উৎসাহিত শিল্পীর মনে তখন সৃষ্টির আবেগ। আবেগ চঞ্চল হৃদয় তখন সাথি খুঁজছে। কোথায় কেমন করে তাকে পাওয়া যাবে।
ঠক্ ঠক্ …..।

কে?
আমি, দরজাটা খোল।
দরজাটা খুলে অবাক বিস্ময়ে, তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল শিল্পী, …..তুমি!
হ্যাঁ চিনতে পারছো?
বিহ্বল শিল্পীর মুখে কথা বেরোতে সময় লাগল। তুমি-তুমি- প্রেম? আঃ আমি তোমাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। আমার আকুলতা তুমি বুঝতে
পেরেছিলে? এসো এসো ব্যাকুল দু’বাহু বাড়িয়ে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে চাইল শিল্পী। অস্ফুট শব্দ করে সরে গেল প্রেম।
কি হল!
দাঁড়াও। অত ব্যাকুল হয়ে উঠলে কেন শিল্পী।
বাঃ আমার রক্তে যে এখন সৃষ্টির জোয়ার।
আকুলতাতেই আমাকে পাওয়া যায় না।
তবে?
কি সঞ্চয় করেছ বল।
আমার এতদিনের সাধনার জ্ঞান।
ও দিয়ে আমি কি করব? ওতে তো আমার প্রয়োজন নেই।
তবে কিসে তোমার প্রয়োজন?
অর্থের।
তার মানে।
ধন, দৌলতের, টাকা পয়সার, গাড়ী বাড়ি, এ তুমি বুঝতে পার না কেন। আচ্ছা তোমার প্রতিষ্ঠা হয়েছে?
প্রতিষ্ঠা বলতে কি বলতে চাইছ?
তোমার মার্কেট ভ্যালু কতটা বেড়েছে?
আমার আবার মার্কেট কি, কোন মার্কেট নেই আমার।
তবে তোমার কোন প্রতিষ্ঠাই হয়নি। প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে মার্কেট ভ্যালু বাড়ে, অর্থ, ধন, মান, গৌরব মর্যাদা একে একে আসতে থাকে ঠিক
যেন ছায়াছবি। অতএব তুমিত আমাকে পাবে না।

দরকার নেই। অর্থ দিয়ে প্রেম আমি কিনতে চাই নে, চিৎকার করে উঠল শিল্পী। কন্ঠে ঘৃণার ঝাঁজ, একটু পরে ভাঙ্গা কন্ঠে শিল্পী বললে তুমি যেতে পার। তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি ব্যাকুল হইনি। তুমি প্রেম নও, লালসা, প্রেমের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছ সমাজে। প্রেম নিরুত্তরে অধোমুখে দাঁড়িয়ে রইল। মূহুর্ত, ক্ষণ, কাল সব নিশ্চুপ পাথরের মত কঠিন হয়ে জমে গেল যেন- কত পরে, ঠিক মনে করা গেল না। শিল্পী আবার বললে- কি তুমি এখনও দাঁড়িয়ে আছ। আমি, আমি তোমার উপযুক্ত নই। অর্থ যা পাই তা উদ্বৃত্ত থাকে না। প্রতিষ্ঠা বলতে যা বোঝ আমার তা হয়নি। পঞ্চমাকারের নৈবেদ্য আমিতো সাজাতে পারবো না। সুতরাং তুমি চলে যেতে পার।
তুমি আমাকে ভুল বুঝ না শিল্পী- ভেজা কন্ঠে শিল্পী মুখ তুলে তাকাল প্রেমের দিকে; বিস্ময়ে বললে- একি তুমি কাঁদছ?
হ্যাঁ।
কেন?
তুমি আমাকে ভুল বুঝলে বলে।
তোমার কথা তুমিইতো বললে, আমিতো কিছু বলিনি।
ও আমার সব কথা নয়।
তবে?
আমাকে তোমাদের সমাজ যা বানিয়েছে, তাই তোমাকে বলেছি। আসলে আমিতো প্রেমই। ক্ষেত প্রস্তুতির পরে ফসল নির্ভর করে জান তো। তোমাদের সমাজ যেভাবে বিন্যস্ত তাতে কোন ফসলই আপন স্বভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। তোমরা যা দেখ সেটা স্বভাবের বিকৃত রূপ। এখানে পয়সা দিয়ে প্রেম, ভালবাসা, যৌবন সবই কিনতে পারা যায়। এখানে সত্যিকার প্রেম ভীরু হয়ে নিভৃতে কাঁদে। তাই আমিও কাঁদছি। এ সমাজে তোমার প্রেমের সন্ধান তুমি পাবে না শিল্পী।
কিন্তু সমাজের যদি পরিবর্তন আসে?
তাহলে আমাদের অন্যরূপ দেখবে বৈকি।
সমাজের পরিবর্তন। সে কি সম্ভব? নিজের মনেই প্রশ্নগুলো আসতে লাগলো, আবার মিলিয়ে যেতে লাগলো। সঠিক উত্তর খুঁজে পেল না শিল্পী। একটা অস্বস্তিকর উদ্বেগ, একটা চাঞ্চল্য নিয়ে হতাশ হয়ে শুয়ে পরল শিল্পী। দুরে, বহু দুরে চোখের তারা দুটোকে মেলে দিয়ে আকাশপাতাল ভেবেই চলল। নৈরাজ্যের একটা কালো মেঘ বহুদুরের বিন্দু থেকে বড় হয়ে শিল্পীকে আচ্ছন্ন করে, গ্রাস করে ফেলল যেন। সাধন পিঠে সুর আর ধ্বনিত হলো না, তানপুরাটাতে অনেক ধুলো জমে গেল, পাখোয়াজের দলগুলো একটা-দুটো করে ছিঁড়ে যেতে লাগল। শব্দের মধ্যে নামল অখন্ড নীরবতা।
কি। ভয় পেলে?
ভয় আর কি, আমারতো কিছু নেই …., হারিয়ে যাবার আর কি ভয়।
না, আমাকে দেখে অনেকেই ভয় পায় কিনা তাই।
তুমি কে?
মৃত্যু।
এখন এসেছ যে? আমার কি সময় হয়েছে?
না।
তবে?
এসেছি তোমাকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে।
সে কি? মৃত্যু বাঁচাতে এসেছে! এ কি করে বিশ্বাস করি বল?

ঠিকই বলেছ। আমাকে তোমরা কেউ বন্ধু বলে জান না, আমাকে আসতে হয়। অনিচ্ছা থাকলেও আসতে হয়। ফুল, কুঁড়ি, পাতা নির্মমভাবে ছিঁড়ে নিয়ে চলে যাই। আমাকে তোমরা নিষ্ঠুর বলেই জান। কিন্তু, বিশ্বাস কর, এতে আমার আনন্দ নেই, আমি অকালে কাউকে নিয়ে যেতে চাই না। কিন্তু ওরা নির্মমভাবে আমাকে ডাকে, আমাকে বাধ্য করে, তোমরা এমনভাবে সমাজ গড়েছ যে সকলেই মরে গিয়ে জ্বালা জুড়াতে চায়। তাই আমি, আসি, অনাহারের বেশে, প্রলয়ের বেশে, মহামারীর রূপ ধরে। দাঙ্গার বিষাক্ত নিশ্বাস নিয়ে।

আমিতো গলায় দড়ি দিয়ে মরতে যাইনি।
না, তা যাওনি বটে, কিন্তু তুমি তোমার সাধনা ছেড়ে দিয়েছ। ওই তোমার অপমৃত্যু।
কি হবে বলো সাধনা করে; কোন প্রেরণা না থাকলে কি করে সাধনায় সিদ্ধি আসবে বলো?
কেন? তোমার প্রেরণার উৎস কারা ছিল?

প্রথম ভেবেছিলাম, ভালবাসা, প্রেম, আনন্দ, কৌতুকই জীবন ভরিয়ে দেবে প্রেরণা দিয়ে। কল্পলোকে তারা ছিল, স্বপ্নের মধ্যে। বাস্তবে যখন ধরতে গেলাম তখন দেখলাম, আমার সে স্বপ্ন অলীক। তারা বললে বিশুদ্ধ প্রেম ভালবাসা এ সমাজে হয় না। আমার ধারনা ছিল মহান সৃষ্টির উৎস হল প্রেম। তারা বললে, কামনা চরিতার্থ করার আধার হল প্রেম, কর্মে উদ্যম উৎসাহ হল ভালবাসা। তারা বোঝালে, আকর্ষণ করে মোহে আটকে ফেলাই ভালবাসা। ধারণা ছিল আনন্দ দিয়ে আয়ুবৃদ্ধি কৌতুক। তারা বললে, মিথ্যাচারণের ছলনাই হল কৌতুক। সুতরাং তুমিই বল আর কি নিয়ে আমি সাধনা চালিয়ে যেতে পারি?

তোমার ধ্যান ধারনায় কিছু ভুল হয়নি। তবে কি জান, তোমার অহংটাই তোমাকে ভোগাচ্ছে।
আমার অহংকার!
হয়, তুমি বুঝতে পারনি, নিষ্ঠাবান সাধকদের মধ্যে অহংটা আসে, তাকেও সাধনা দিয়ে ত্যাগ করতে পারলে তবে সিদ্ধির পথ পাওয়া যায়।
কি জানি, আমি তো ঠিক বুঝতে পারছিনে।
না বোঝার কিছু নেই, বন্ধু। আসলে তোমার প্রেরণার উৎস যারা হবে তারা তো সাধারণ মানুষ। তাদের সঙ্গে মিশতে হবে, সব রকম অহং ভুলে। বংশ, গৌরব, পদমর্যাদা, পান্ডিত্য এগুলো মনের গভীরে চাপা দিয়ে ওদের হয়ে তাদের সঙ্গে মিশতে হবে। তবেই ওদের হৃদয়ের খোঁজ পাবে। আর সেই হৃদয় নিয়েই তো তোমার কারবার জমে উঠবে।
ওরা আমায় প্রেরণা দেবে? কেমন করে …..?
সেই সাধনাতেই তো তোমাকে আবার বসতে হবে। ওইটুকু কাজই তোমার বাকি আছে। ওদের মনের যে অংশটা গভীর, আঘাতে আঘাতে কঠিন নির্মম হয়ে গেছে, সেই অংশটুকুর মেরামতি কাজ তোমার বাকি। ওরা তোমাকে দুঃখ দেবে, প্রবঞ্চনা করবে, সন্দেহ করবে কিন্তু তোমার নিষ্ঠা তোমার একাগ্র সাধনায় ওদের মন তুমি জয় করতে পারবে। কুটিল আবর্তের মধ্যে থেকে, সকল ঘূর্ণাবর্তের মধ্য থেকে ওরা নিজেরাই পথ খুঁজে নেবে, তুমি শুধু সেই পথ খোঁজার সহায়ক হবে। তাদের হৃদয় বৃত্তির পবিত্র সুকুমার প্রবৃত্তিগুলি তুমি গানে গানে উজ্জীবিত করে তুলবে। তখন কঠিন পথ ওদের দুর্গম মনে হবে না। হতাশ হয়ে আমাকে ওরা ডাকবে না, বীরের মৃত্যুবরণ করে পথের বাঁধা অতিক্রম করে ও এগোবে। তাই বলছিলাম, তোমার এখনও যাওয়ার সময় হয়নি। নতুন করে তানপুরায় আবার তার বাঁধ, পাখোয়াজটা আবার ঠিক করে নাও, নতুন সুর তোল শিল্পী, নতুন সুর তোল।
বেশ তুমি যখন বলছ, আবার আমি সাধনায় বসবো, প্রেরণা যদি পাই সৃষ্টি হবেই। সে সৃষ্টি যদি সমাজ পরিবর্তনের সহায়ক হয় তবে আমি সার্থক হবো, ধন্য হবো।
ঠিক তাই- তখন আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব। সে যাওয়া হবে আনন্দের, সে মৃত্যু হবে তৃপ্তির।
দূরে প্রসারিত স্থির চোখের তারা দুটি আবেগে বুজে এল শিল্পীর, সে পাশ ফিরে গভীর ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেল।
ডাক্তার বললেন ঘুমোচ্ছে ঘুমোক, এখন ডাকবেন না। আর ভয় নেই। শ্রান্তি কমে গেলেই ও সুস্থ হয়ে জেগে উঠবে।

Check Also

সােনার বাংলায় সােনালী সকাল

সােনার বাংলায় সােনালী সকাল আব্দুল আজিজ অগ্রণী উদিত সূর্যের রক্তিম আভা, দেয় বাড়িয়ে সকালের শােভা। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *